খৈয়াম কাদের : বিচিত্র চিন্তার কবি
দ্বীপ সরকার
সমকালীন বাংলা কবিতার পরিসরে কবি খৈয়াম কাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। খৈয়াম কাদের নব্বই দশকের কবি হলেও আশির দশকের কাব্যশৈলীর সচেতন প্রভাব লক্ষ্য করা যায় তার কবিতায়। আবার শূন্য দশকের যে কাব্যভাবনা এবং কবিতার গঠনশৈলীর পরিবর্বন ঘটেছে—তার প্রভাবও কবির কবিতায় উপস্থিত লক্ষ্য করা যায়। ফলে তার কাব্যভাবনা,নির্মাণশৈলীতে শক্ত পরিবর্তন ঘটেছে। তার অধিকাংশ কবিতার শরীর ছোট—কিন্তু ভাব দর্শন ব্যাপক। তিনি উচ্চারণের চেয়ে অন্তর্গত অনুরণনে বিশ্বাসী। তাঁর কবিতা পাঠকের সামনে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হাজির করে না। বরং প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেয়—পাঠককে গভীরে যেতে বাধ্য করে। কবি প্রচারে বিশ্বাসী কম—সেকারণেই সমসময়ে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে একটু আধটু উপস্থিত লক্ষ্য করা গেলেও দশবছর বা তারও আগে তার পদচারণা একেবারেই ছিলোনা। সম্ভাব্য কারণে কবির কবিতাশক্তি বাংলাদেশের সামগ্রীক সাহিত্যের পরিসরে খানিকটা ম্রীয়মান।
আগেই বলেছিলাম কবির কবিতাবয়ব ছোট। এটা শূন্য দশক থেকে চলমান দশকের তরুণ কবিদের একটা প্যাটার্ন। এই প্যাটার্নের কবিতা পাঠককে দিকবিদিক মনোনিবেশ করতে বাধ্য করে না—বরং একটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যায়। কবি খৈয়াম কাদেরের কবিতা তেমনি পাঠকের সামনে ছোট পরিসর নিয়ে হাজির হয়। তবে কবিতার ভাষা অনেকটা টাইট,অতিবিমূর্ততার দিকে ধাবিত করে। যেমন একটা কবিতা এমন—
“স্মৃতি নীল হলে নিজেকে অমর মনে হয়,
মনে হয় ইতিহাস যেনো এক কবরের মমি;
ভোলা তো যায়না কিছু বারবার সব মনে পড়ে
স্মৃতির মিনারে ওড়ে বিস্মৃত কালের ঘুড়ি!
বদলের স্বপ্ন শেষে আগের দৃশ্যই ফিরে আসে,
কৌমের ভূমিতে ঝরে বিবিধ বৃষ্টির পানি;
বাবার পীড়িত মুখ রঙের ফানুসে নড়েচড়ে,
মায়ের হেঁসেলে পোড়ে কষ্টের সিম্পনি!
পাখিনগরের যত গান,যত সরোদের সুর
বেজে বেজে সরে যায়,সরে যায় দুর-বহুদূর”
(কষ্টের সিম্ফনি,ডানাঅলা মাছ)
এটি একটি পূর্নাঙ্গ কবিতা। কবিতা শরীরে ছোট,কিন্তু শরীরের ভেতরে যে সুন্দর্য লুকিয়ে আছে তার ব্যপ্তি বিস্তর। অনেকটা টাইট এবং ঠাসা ভাবালংকারে নির্মিত—পাঠক এখানে সহজে দিশা খুঁজে নাও পেতে পারে। তবে এর দর্শন সুনির্দিষ্ট। এটাই চলমান দশকের কবিদের কবিতায় স্বকীয় মাত্রার যোগ—যেটা খৈয়াম কাদের নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেছেন। এ রকম চমৎকার অনেক কবিতা আছে।
কবিতায় নদীমাতৃক চেতনার প্রভাব : কবির জন্মগত টান
খৈয়াম কাদের জন্মগতভাবে উত্তরবঙ্গের মাটি মানুষের কবি। বিশেষ করে বগুড়া জেলার উত্তর-পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ সারিয়াকান্দি,গাবতলি অঞ্চলের যে নদী ভাঙ্গণ,নদী সংশ্লেষ জনগণের যাপিত জীবনের দৃশ্য তাকে তাড়িত করেছে। কবি বলেন,
“প্রবল বন্যায় গর্ভবর্তী নদী
ভেসে যাচ্ছে জীবন, যেমন
কচুরিপানারা ভেসে যায়
দৃশ্যের সৌন্দর্যে শিল্পের উৎস হেসে ওঠে
ত্রাণের বণিক ভাবে প্রকৃতির এ খেয়াল
কিন্তু চৌকস তন্ত্রের অনিন্দ্য প্রচ্ছদ হতে পারে!”
(দুঃখগুলো সমত্ত পোয়াতি)
এখানে যেমন নদীভাঙ্গনের কথা উঠে এসেছে তেমনি নদী অঞ্চলের মানুষের অসহায়ত্ব উঠে এসেছে। কচুরিপানার মতো অসংখ্য জীবন ভেসে যায়। এবং তারা বণিক ত্রাণকর্তার দিকে সব সময় চেয়ে থাকে।
অন্য আরেকটি কবিতায় বলেছেন,
“ফি-বছর বর্ষাকালে
আমাদের মেহমান হয় -
মেঘের বর্ষণ
জলের প্লাবন
নদীর ভাঙন,
স্নানে স্নানে আমরা শীতল হই, নিঃস্ব হই
আনন্দে সানন্দে তখন হাসতে থাকি!
আমাদের উঠোনে ত্রাণ নামে
আমাদের পাশে নিয়ে
ত্রাতারা ছবি উঠান, কাঁদেন!
উল্লাসে বোদলে যায়
আমাদের প্যাথোলজিক্যাল গণিতের খাতা!”
(কবিতা,ফি-বছর বর্ষাকালে)
নদী কেবল ভাঙনের দুঃখ নিয়ে আসে না,বরং একজন কবির নিকটে তা বৈচিত্র অভিজ্ঞতা বটে।
এখানে নদী তীরবর্তী মানুষ এমন কি কবি নিজেও
কখনও কখনও উল্লাসে মাতেন। বর্ষাজল,সাথে নদীর উথাল পাথাল ঢেউ। ত্রতারা ত্রান নিয়ে উঠোনে আসেন। ছবি উঠান। সকলের চোখে মুখে হাসি। এতে কবির চোখ ছলমল হয়ে ওঠে।
আরেকটি কবিতার দিকে চোখ বুলিয়ে দেখি একই সুর—যা কবির দেখা অভিজ্ঞার প্রতিফলন বলা যায়। কবি যখন বলেন—
“আমার স্বপ্নরা এখন বালেগ হয়ে গেছে
আমাকে ছাড়াই তারা যমুনার ঢেউ খেতে পারে,
কষ্টের উঠোন খুঁড়ে নিয়ত জাগাতে পারে সহজিয়া গান”
(আলফা জারণ,পারদ বিশ্বাস)
এখানেও কবি যমুনার তীরবর্তি মানুষের দিকে নজর দিয়েছেন। তবে এই চরনের ভাব দর্শন সহজে ধরা দিতে বাধ্য নয়—যা অনেক বিজ্ঞদের মতে প্রকৃত কবিতা বুঝার বিষয় নয়,বুঝে আনার বিষয়—এমন ব্যঞ্জনার দিকে ইঙ্গিত করে। কবির স্বপ্নরা বালেগ হয়ে গেছে অর্থাৎ পরিনত হয়ে গেছে যার ফলশ্রুতিতে যমুনার ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে। এখানে কবি নিজেই যমুনার তীরবর্তী মানুষের প্রতীক হয়ে উপস্থিত হয়েছেন—যাদের স্বপ্ন প্রতিনিয়ত ভেসে যায়,ভাগ্য তাদের স্রোতের অনুকূলে চলে যায়। কবি এখানে ব্যথিত হোন—তাই তো বলেন “আমাকে ছাড়াই” তাদের স্বপ্ন ভেসে যাচ্ছে,বরং কবিও যেন অনুস্বরে বলতে চান,আমাকেও সাথে নাও। কবি ভেতরে ভেতরে মর্মাহত হোন। কবি যেন নদীর মানুষ। কবিকে এতোভাবে এদের জীবনচিত্র খুুঁড়ে খুঁড়ে খেয়েছে—তা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। কবি নদীকে কখনো ভাঙনচিত্রৈ, কখনো গড়ার চিত্রে আবিস্কার করেন। কবি বলেন—
“নদীকে সৃষ্টির পাঠশালা বলি,সেখানে অধিত হয়
মৃত্তিকা-শিল্পের কলা,জীবন-চক্রের ইতিবৃত্ত-গীতি;
জলের অক্ষর ধুয়ে
ঋষির পুস্তক ভনে
নিসর্গ-নিত্যের ব্রাত্যকথা
জীবাশ্মে জারিত অমিতাভ স্মৃতি”
(লাঙ্গলের খেয়া ভাঙ্গে জীবনের গতি)
“নদীকে সৃষ্টির পাঠশালা বলি”—কবি একটা বিশ্ময়কর চিন্তার প্রভাব ফেলেছেন এখানে। নদী শুধু ভাঙ্গে না—সৃষ্টিও করে। প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে তুলনা করে বলেন,শুধু দৃশ্যমান স্কুলে শিক্ষা গচ্ছিত নেই বরং নদীর দিকে তাকাও,সেখানেও শিক্ষার বিভিন্ন অনুষঙ্গ নিহিত আছে। এখানে বস্তুগত শিক্ষা এবং কাল্পনিক শিক্ষার যে দর্শন—পৃথিবী সৃষ্টি থেকে অদ্যাবধি নদীর ভেতরে লুকিয়ে আছে তার একটি গুরুত্বপুর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে এখানে। যা অন্যকোন কবি এমন দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ করেছেন কিনা আমার জানা নেই। নদীর মাটি দিয়ে মৃত্তিকা শিল্পের আবিস্কার এবং তা দিয়ে জীবনচক্রের যোগান,অর্থনৈতিক উপার্জন—এভাবেই অনেকের জীবনের ইতিবৃত্ত ঘটে যায়। এটা কবিকে ভীষণভাবে উপলব্ধিতে প্রথিত করে। তার পরের লাইন “জলের অক্ষর ধূয়ে /ঋষির পুস্তক ভণে”। এটাও পাঠককে সিরিয়াস হতে বাধ্য করে। জলের অক্ষর বলতে কিছু হয় না। এটা একটা পরাবাস্তব অলংকার—যা প্রতীকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। কবির কল্পনাই তখন মুখ্য ভূমিকায় আসে। এখানে কাল্পনিক ঋষির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন,নদীর তীরে কোথাও ঋষি বা আধ্যাত্নিক গুরু তার কিতাব খুলে ধ্যানমগ্ন আছেন। কখনো সেই কিতাবের কালো অক্ষর নদীজলে ধূয়ে নিচ্ছেন আর নিসর্গের যাপিত জীবন তথা পঁচা সমাজব্যবস্থা নিয়ে ভাবছেন। এখানে একটা বিষয় লক্ষণী পরাবাস্তব কখনো অবাস্তব নয়। বাস্তব, তবে তা স্বপ্নের বা কল্পনার ভেতর দিয়ে চলা একটা আবহ। নদী তীরবর্তী মানুষের জীবনচক্র—যা দৃশ্যমান। পরক্ষণেই ঋষির উপস্থিতি—যার সুনির্দিষ্ট অবস্থান বা স্থানের কথা বলছেন না। এ বাদে, খৈয়াম কাদের কখনো নদীমাতৃক হয়ে উঠেছেন,কখনো গরীব দরিদ্র মানুষের হয়ে উঠেছেন—তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কবিতায় প্রকৃতি ও গ্রামীণ সভ্যতার প্রতিভাস:
কবিমানস মাত্রই গ্রামের সবুজ, হলুদ, ধূসর রঙের কবি। আকাশ পাহাড় কবির দৃষ্টির ভেতর খেলা করে। কবি খৈয়াম কাদেরের কবিতায় গ্রাম এবং প্রকৃতিদৃশ্যের চিত্র নানাভাবে এসেেছ। কবিতার প্রতিভাষ্যে,প্রকৃতির অপরুপ সুন্দর্য কবিকে এড়িয়ে যেতে পারেনি। কবি যেমন বলেন—
“আকাশে তাকিয়ে আকাশ দেখি না,সাগরে দেখি না জল
পাহাড়ের গায়ে দেখি মরুর ধবল
তবে কি দৃষ্টির মাঠে ভ্রম ঘটে গেলো
নাকি প্রকৃতি হারালো তার আদল?”
(বাতাসের ছায়া,ডানাালা মাছ)
কবি এখানে কিছুটা পান্ডিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। কবিতার মধ্যে যখন বিভিন্ন চিত্রবৈভব ঘটে,কখনো বিরোধী,কখনো স্ববিরোধী,কখনো বিপরীত চিন্তা এবং সেটা যদি যুক্তিযুক্ত ও কাব্যিকতার ভেতরে ব্যঞ্জনা তৈরি করে তখন কবির দক্ষতাকে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে না। এখানে কবি শঙ্কামুক্ত নন। কবির শঙ্কা— প্রকৃতি এরুপ হচ্ছে কেন। নিজের দৃষ্টিকেও প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন “তবে কি দৃষ্টির মাঠে ভ্রম ঘটে গেলো?”—অর্থাৎ আকাশে আকাশ নেই,পাহাড়ে শিলামাটি,লালমাটি থাকার কথা—অথচ ধবল মরু বা সাদা মরুভূমি। বিষয়টা বিপ্রতীপ—এরকম বহু কবির কবিতায় এসেছে,আসে। পরস্পর বিরোধী উচ্চারণ, অথচ তা কবিকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এটা গেলো কবিতার দর্শনগত অবস্থান। তবে প্রকৃতির যে অপার সুন্দর্য তার ইঙ্গিতময় উচ্চারণও এটা। প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ,উপাদান, দৃশ্যকল্প বিভিন্ন কবিতায় বিভিন্নভাবে চিত্রিত হয়েছে। কবি এভাবে বলেন—
“আলপথে হেঁটে হেঁটে ধানের ক্ষেতের কাছে গেলে
কারুজ্য কাথান-রাঙ্গা
অপরুপ এক বাংলাদেশ দেখা যায়
মনে হয় কবিতার চিত্রচারু পতাকার শোভা”
(লাঙ্গলের খেয়া ভাঙ্গে জীবনের গতি)
এমন দৃশ্যপট প্রত্যেক কবির ভেতর বিরাজিত। মাটি ও প্রকৃতির কাছে এভাবেই কবিরা ঢুকে যায়। জমির আলপথে যে কবি কখনো হাঁটেনি—তার মধ্যে এই চিত্রকল্প আসবে কি করে। খৈয়াম কাদের আলপথে হেঁটেছেন,তারপর বলেন,“কারুজ্য কাথান-রাঙ্গা”—প্রকৃতি যে নকশি কাঁথার মতো কারুজ্য। কবি জসীম উদ্দীনের নকশি কাঁথার মতো খৈয়াম কাদেরও সবুজের ভেতর হাঁটেন। এখানে প্রকুতির সুন্দর্যকে “পতাকা”র সাথে উপমায়িত করা হয়েছে। প্রকৃতির সুন্দর্য যেন সবুজের ভেতর লালের প্রতিভাস। আবার অন্য আরেকটি কবিতায় কবি অন্যভাবে বলেন—
“পাখা মেললেই সফেদ সোয়ান
ঈর্ষার দহনে কাঁপে হায়েনার দল:
কোকিলের কণ্ঠে যদি
শান্তির সঙ্গীত বেজে ওঠে
তাহলেই আকাশ ছাপিয়ে ওঠে
অগণীত শেয়ালের হুক্কাহুয়া”
(আদি সংবেদ,পারদ বিশ্বাস)
কবি উদাসমনে হেঁটে চলেছেন। কখনো নদীপারে,বনজঙ্গলের তীর ধরে বহুদূর পথে। আর তখনি চিত্রিত হয় “সফেদ সোয়ান” বা সাদা রাজহাঁস আকাশের দিকে পাখা মেললেই হায়েনার দলেরা ঈর্ষান্বিত হয়। যদিও এই উচ্চারণ পাঠককে বিভ্রান্তের দিকে ঠেলে দেয়। কাঁপা শব্দটি ভয়,আতঙ্ক,শঙ্কা শব্দগুলোর পরবর্তী পরিস্থিতির সমার্থক শব্দ। তারপর বলছেন, “কোকিলের কণ্ঠে যদি/শান্তির সঙ্গীত বেজে ওঠে/তাহলেই আকাশ ছাপিয়ে ওঠে/ অগণিত শেয়ালের হুক্কাহুয়া”। অসাধারণ ইমেজ তৈরি করেছেন এখানে। কবি এখানে “যদি” শব্দ প্রয়োগে এক অনিশ্চিত তাড়নার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। সত্যি যদি কোকিল গান তোলে কণ্ঠে, এই আকাশে বাতাসে শান্তির হাওয়া প্রবাহিত হবে। “কোকিলের গান” শান্তিসুরের প্রতীক। আবার “শেয়ালের হুক্কাহুয়া” এখানে সামাজের অসাধু মানুষের যে চিৎকার, হুংকার—তার প্রতীকী চরিত্রে এসেছে। কোকিল গান ধরলে সমাজের অসাধুদের চিৎকার বিলীন হয়ে যেতে বাধ্য। কবির চিন্তা এখানে স্বাতন্ত্রতার স্বাক্ষর রাখে। সাহিত্যের পরিসরে প্রকৃতির সুন্দর্য অনুস্বীকার্য একটা অনুসঙ্গ এবং উপাদান—যার সুন্দর্যের বর্ণনা কখনো নিঃশ্বেষ হবে না। যে কবিকে প্রকৃতি টানেনি এবং কবিও প্রকৃতিকে টানেনি—তিনি কবি হওয়ার নিখাদ দাবী রাখতে পারে না। কবিজীবনের যত কবিতা তার বৃহদাংশ হতে হবে,প্রকৃতি এবং প্রেমের কবিতা। খৈয়াম কাদের তাই বারবার প্রকৃতির কাছে ফিরে এসেছেন। যেমন আরেক কবিতা এরকম—
“ছইতোলা গরুর গাড়ি ও
পালকি দোলের সুখ ফিরে দাও
ফিরে দাও
সিরনি ফিরনি
ও পিঠা মিঠা আর
কলসি জলের স্বাদ”
প্রকৃতিক সুন্দর্য ও পুরাতুন সমাজ ব্যবস্থার চরম সত্য উচ্চারণ হতে পারে এটা। কবি অতীতকে ভুলতে পারেন না। সময়ের আবর্তে সভ্যতা আবর্তিত হয়। হতে পারে—কিন্তু কবির চেতনা থেকে তা মুছে যায়না। গরুর গাড়ি,পালকি—পুরাতুন সমাজ ব্যবস্থার প্রতীক হয়ে এসেছে। এখন যা বিরল—সেটা একটা রপান্তরিত মিথ। গরুর গাড়ি,পালকি—এখন বিরল এবং মিথ উপাদান। কিন্তু কবি প্রকৃতির কাছে নিবেদন করেন—এগুলো ফিরিয়ে দাও। তার সাথে নিবেদন করেন,সিরনি, ফিরনি,পিঠা মিঠার আমেজ এবং স্বাদ ফিরিয়ে দাও,কলসি জলের স্বাদ ফিরিয়ে দাও। এখানে “কলসি” গ্রামীণ সভ্যতার প্রতীক—সেটাও বিলুপ্তির পথে। লক্ষণীয় “ফিরে দাও” শব্দদ্বয় ভুল প্রয়োগ। ফিরে তাকানো,মুখ ফিরাও,ফিরে ফিরে আসে,ফিরে দাও,—যা ঘটমান অর্থে আসে। হতে পারতো “ফিরিয়ে দাও”—তাহলে কবির নিবেদন আরো বলিষ্ট হতো। যা হারিয়ে গেছে সেটা পাওয়ার যে আগ্রহ—এ ক্ষেত্রে “ফিরিয়ে দাও” ক্রিয়াপদ যুক্তিযুক্ত। কবি তো সেটাই চেয়েছেন—যা অনেক আগেই হারিয়েছেন,যা বিলুপ্ত এবং বিলুপ্তির পথে।
কবিতায় শহর/নগর সভ্যতার প্রভাব:
কবি যখন পেটের তাগিদে শহরে আসেন,জীবনচক্র তখন মোড় নেয় অন্যদিকে। শহরের যান্ত্রিকতা,শঠতা,শহরের অলিগলিজুড়ে বিভৎসতা—তা কবিকে ভাবিয়ে তোলে। এ যেনো ভিন্ন সমাজ ব্যবস্থা— অধিকন্ত আলোর মিছিলের নিচে অন্ধকার বসে আছে। প্রেমের বদলে অবিশ্বাস,অভিনয়,দখলদারদের রাজত্ব, চারদিকে মিছিল, ককটেল, বোমা,নেতাদের ভাগবাটোয়ারা—এইসব দৃশ্যকল্প কবিকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে। গ্রামের নদীমাটির সমাজ আর শহরের অভিজাত্বে গড়ে ওঠা সমাজ এক নয়। কবি যেমন বলেন—
“আমি তো চাইনি এই অভিনীত প্রেম,
আত্নার বদলে এতো যান্ত্রিকতা;
বাটোয়ারা গণিতের অভাজ্য অঙ্কের মাঠে
আমি তো চাইনি কোনো
বোমারু বিদ্যার পাঠ
নিসর্গ-নন্দের নিকরুণ শল্যকলা”
(আমাকে ফিরিয়ে দাও,লাঙ্গলের খেয়া ভাঙ্গে জীবনের গতি)
কবি শহরের অভিনীত প্রেম চান না,প্রেম তো হবে আত্নার সাথে আত্নার। অথচ এই যান্ত্রিকতা প্রেমকে নিষ্ঠুর করে তুলেছে। তারপর শহরের রাজনৈতিক রাজত্ব,চাঁদাবাজ,স্ট্যান্ডবাজ— ইঙ্গিতের ভেতর দিয়ে হুংকার তুলেছেন। “বাটোয়ারা গণিতের অভাজ্য অঙ্কের মাঠে”-এখানে “গণিত” হয়ে উঠেছে ভাগবাটোয়ারার হিসাব নিকাশের প্রতীক আর “মাঠ” শব্দ প্রয়োগে এই নৈরাজ্বতার ব্যাপ্তিকে ইঙ্গিত করেছেন। চাঁদা,লুটতরাজ,দখলদারিত্ব এমন উচ্চে চলে গেছে যে বিশাল মাঠের মতো ছড়িয়ে পড়েছে তার প্রভাব। আরেকটি কবিতায় নগরসভ্যতার যে চিত্র প্রতিভাস হয়ে উঠেছে তা এরকম—
“রেললাইনের সতীন স্লিপার দু’টো
সমান্তরাল শুয়ে থাকে
মৌন অপেক্ষায়
ট্রেনের চাকার উত্তপ্ত ঘর্ষণে
নিবিড় ধর্ষণে
ক্ষণে ক্ষণে নিজের অস্তিত্ব টের পায়”
(অনন্ত শান্তির হরিহর,ডানাঅলা মাছ)
শহরের জনাকীর্ণতা,চারদিক হইচই,বাস ট্রেনের হর্ণ,উচ্চশব্দ,যানজট—এ যেনো কবির মনস্তত্ত্বে লাগে। রেললাইন যেন কোন প্রিয়সীর অপেক্ষায় শুয়ে থাকে। (যদিও কবি এখানে পরিস্কার করেননি—রেললাইন কার অপেক্ষায় থাকে)। রেললাইনের স্লিপার দুটি পরস্পর সতীনের মতো। এখানে “সতীন” শব্দটি স্লিপারের চমৎকার একটি উপমা। সতীন শব্দটি মিথস্ক্রীয় শব্দ যা বহুকাল থেকে সমাজে দ্বন্দ্ব ও সন্দেহের প্রতীক হিসেবে চাউর আছে। একারণেই স্লিপারের “উত্তপ্ত ঘর্ষণ” দারুণভাবে দ্বন্দ্বের প্রতীক হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। এটা শহরজীবনের প্রতিদিনের দৃশ্যকল্প। এখানে আরেকটি বিষয় খুব লক্ষণীয়,“ক্ষণে ক্ষণে নিজের অস্তিত্ব টের পায়’-এই উচ্চারণের মাধ্যমে কবি অস্তিত্ববাদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। “অস্তিত্ববাদ” চলমান সাহিত্যধারায় অনুপ্রবেশ ঘটেছে বেশ কয়েক দশক আগে থেকেই। সতীন সংসার যেমন অশান্তি আর দ্বন্দ্বের প্রতীক সমাজে পরিচিতি পায়—সেখানে টিকে থাকা মানসিকযুদ্ধের চেয়ে কম নয়। তেমনি স্লিপার দুটো— যুদ্ধের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে চারপাশে অশান্তি ছড়ায়। কবি এই চিত্রকল্পে নগরজীবনের অভিজ্ঞতাকে টেনে এনেছেন নিপুনভাবে। কবি শহুরে জীবনের প্রতিদিনের যে ঘটমান দৃশ্য মনে-চত্তে তাড়িত করে তার কিছু পঙক্তি এরকম—
“তাদের পবিত্র নামে
মিছিল করি,শ্লোগান দেই
ভুলে যাই ঘরের খবর
তাদের পকেটে রাখি আত্ন-সনদের খেই”
(পলিটিক্স)
শহর মানেই মিছিল,শ্লোগান,রাজনীতি—একজন কবিকে এমন দৃশ্য এড়িয়ে যেতে পারে না। এখানে “তাদের পবিত্র নামে”— একটা শক্ত অথচ চরম ব্যঙ্গাত্নক উচ্চারণ। মানুষ ধর্মীয় গুরুজনকেও “পবিত্র” বলে মুখে উচ্চারণ করেন না। অথচ একজন রাজনীতিবিদকে “পবিত্র” বলে মৌন অস্বীকৃতি,ধিক্কার, ঘৃণার দিকে আঙ্গুল তুলেছেন—এটাই কবিকে সাহসী করে তুলেছে। এই উচ্চারণে দেশের প্রচলিত ধারার রাজনীতির গভীরের কথা উঠে এসেছে। যারা মিছিল করে,ঘরের খবর রাখার সময় পাননা—তারাই নেতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন। নেতাদের পকেটে নিজেদের আত্ন সনদ,মান মর্যাদার কথা বলে প্রকারন্তরে জিম্মিদশার দিকেই প্রশ্ন ছুঁড়েছেন। তারা এক সময় খেই হারিয়ে দিশাহীন হয়ে পড়ে। একই কবিতায় পরের স্তবকটা এরকম—
“ওনারা রুহানি ছবকের ওলি
জীবনের সব গলি চেনেন,
মানুষকে বানান মুরিদ
মানুষকে হরণ করেন,ভাঙেন গড়েন
মানুষকে নিঃস্ব করে মানুষেরই হয়ে যান সুহৃদ”
(পলিটিক্স)
আগের স্তবকেরই ধারাবাহিক উচ্চারণ এটা। এখানেও নেতা এবং রাজনীতিবিদদের “রুহানি ছবক” “ওলি” শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। রুহানি এবং ওলি শব্দদ্বয় আরবি শব্দ—যা আদিকাল থেকে পবিত্র মানুষের প্রতীক হয়ে এসেছে এবং “রুহানি ছবক” শব্দদ্বয়ও একইভাবে সেই পবিত্র মানুষ অর্থাৎ ওলি আউলিয়াগন যা বলেন,যা নসিহত দেন,যা বক্তৃতা দেন তা রুহানি ছবক বা পবিত্র। অথচ কবি এই শব্দগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে নেতাদের দারুণভাবে ঘৃণা প্রদর্শন করেছেন—যা বলিষ্ট কণ্ঠস্বরের লক্ষণ। এখানে শোষন ও শাসনের আরেক দিক ফুটে উঠেছে এইভাবে—নেতারা আশেপাশের সহজ সরল মানুষকে কাছে টানেন। তারা প্রতিটি মানুষকে চেনেন,প্রতিটি জীবনের ওলিগলি চেনেন—তাদের কাউকে কাউকে মুরিদ বা সাগরেদ বানান। পরক্ষনেই বলছেন,“মানুষকে হরণ করেন,ভাঙ্গেন গড়েন/মানুষকে নিঃস্ব করে মানুষেরই হয়ে যান সুহৃদ”। “মানুষ” শব্দ ব্যবহারের ফলে শুধু তার আশেপাশের লোকজন নয় বরং দেশের সমগ্র সাধারণ জনগণের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। নেতারা জনগণকে হরণ করছেন,শোষন করছেন—পরিস্থিতি এমন যে তাদের হাতেই জনগণের ভাগ্য। তাদের হাতেই ভাঙা গড়া—এভাবেই নিঃস্ব হচ্ছে জনগণ। অথচ এইসব শাসকরাই তাদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠছেন। কবির চোখে এমন দৃশ্যকল্প ধরা না দিয়ে পারে না—এটাই খাতা কলমের প্রতীকী দ্রোহের ইঙ্গিত।
কবিতায় অধিকার চেতনার প্রভাব:
কবিগণ অধিকার নিয়ে সব চেয়ে বেশি সোচ্চার। সেটি কখনো মানবিক,কখনো পশু বা জীবজন্তুর অধিকার। জীবজন্তুর অধিকার যদি মানুষের দ্বারা প্রভাবিত হয় তখন এর সুফল প্রতিষ্ঠার ভুমিকায় সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়ের দিকে ধাবিত হয়। আর যদি জীবজন্তুর অধিকার তাদের ভেতরের আন্তকোন্দল,দ্বন্দ্বের দিকে ইঙ্গিত করে তখন কবিদের এমন উচ্চারণ জীবজন্তু বা পশু পাখিদের কাজে আসে না। কারণ তারা মানুষের কথা শুনতে পান না। কবি খৈয়াম কাদের জীবজন্তুর পরস্পর দ্বন্দ্ব,পরস্পরের অধিকার নিয়ে এভাবে কথা বলেন—
“অবশেষে অভিধান বদলেই গেলো
জলের কুমিরগুলো অধিকারে নিয়ে নিলো
বন বনানীর ছায়া;
পাখিরা উদ্বাস্তু হলো
অচেনা কচ্ছপ খেলো
আকাশের নীল ও মেঘের মায়া”
(ধানের পরাগ,শেরোয়ানী মাঠ)
জলে বসবাসকারী জন্তুদের মধ্যে কুমির ভয়ংকর প্রাণীখেকো একটা জন্তুু। কুমির এখানে দখলদারীত্বের প্রতীক—যার প্রভাবে জলে অশান্তির আওয়াজ কবি শুনতে পান। জলে বড় মাছ ছোট মাছদের খায়। আর কুমির জলের রাজত্বের ভুমিকায় থাকে। বড় মাছ ছোট মাছ এমনকি মানুষকেও আক্রমণ করে থাকে। জলের তীরবর্তী বন বনানীর ছায়াও অধিকারে বা দখলে নেয়। এটা কবির অবাস্তব ও কল্পনাপ্রসূত উচ্চারণ। কুমির স্থলে বসবাস করেন না তাই বনাঞ্চল দখল—এটা অসত্য। পরে বলছেন “পাখিরা উদ্বাস্তু হলো”এটাও অতি কল্পনাপ্রসূত। তবে পরের লাইনে বলছেন “অচেনা কচ্ছপ খেলো”—এটা কুমিরসত্ত্বার চিরাচরিত ঘটনা। “অবশেষে অভিধান বদলেই গেলো”—কবি এখানে কুমিরদের আচরণকে সাংঘাতিকভাবে তীরবিদ্ধ করেছেন। বন বনানী দখল,পাখিদের উদ্বাস্তু হওয়া—এগুলো অভিধান বদলানোর সাথে তুলনা করেছেন—যা আমুল পরিবর্তনের মতো।
কবিতায় জাতিবোধ চেতনার প্রভাব:
কবি জীবনকে গভীরভাবে বিচার বিশ্লেষণ করেন—তার সাথে সময়সচেতনও বটে। কবি সময়কে অগ্রাহ্য করতে পারেন না। সময়ের স্রোতে কতো কিছুই না ঘটে। তার ওপর আকাশ সংস্কৃতির ব্যাপকতা। ফলে চারদিকে ঘটনাকে অঘটনা,সত্যকে মিথ্যা,আলোকে অন্ধকার বা অন্ধকারকে আলো—এ রকম স্বেচ্ছাচারি মিশ্রণ বা গুজব ব্যাপকভাবে সহজেই চাউর হয়। সোস্যালমিডিয়ার যুগে কোনটা ভালো কোনটা মন্দ,কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক—যা তরুণ প্রবীণ সকলেরই বিভ্রান্তের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। অনেকেই এর সুযোগ গ্রহণ করে স্বার্থ উদ্ধার করেন। সমসময়ে এর প্রভাব এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে—দেশ এবং জাতি ভয়ংকর সংকটের মুখে। সঙ্গত কারণে দেশবোধ,জাতিবোধ বিভিন্নভাবে বিভাজিত হয়ে পড়েছে। কবি তাতে ব্যথিত হোন। কবি তাই বলেন—
“দেশবোধ জাতিবোধ সংজ্ঞা পায়নি আজও
গুজবের স্রোতে ভাসে সত্যের মা-ও
লুকানো সুতোর টানে শরীর দুলিয়ে নাচে নীরব পুতুল
মৃত্তিকা হারিয়ে ফেলে বগলে আগলে রাখা একুল-ওকুল”
(দাসত্ব আরাধ্য হলে)
এই স্তবকে কবি জাতিবোধের অনেক প্রশ্নই খোলাসা করেছেন। কবি বিগত সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা যেভাবে অবলোকন করেছেন,তা কেবল কবির ব্যক্তিগত আশঙ্কা নয়,বরং পুরো জাতির আশঙ্কা। কবি মনে করছেন কেউ কোথাও লুকিয়ে থেকে নীরব পুতুলের মতো ভূমিকা পালন করছেন। লুকানো সুতোয় টান দিচ্ছেন আর দেশ হয়ে উঠছে অস্থিতিশীল। ফলে গুজবের বিস্তৃতি তীব্রতর হয়। কবি আশঙ্কা করছেন,সত্যের অদৃশ্য মা—সেও এই গুজবের স্রোতে ভেসে য়ায়। এই মৃত্তিকা,এই দেশ দিশেহারা হয়ে বিভিন্নভাবে সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলার উপক্রম। কবি এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেন না। কবি তাই বলছেন,“দেশবোধ জাতিবোধ সংজ্ঞা পায়নি আজও”। মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে—ফলে দেশবোধ,জাতিবোধ ভীষনভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে দেশ সংজ্ঞা পায়নি বা মেরুদন্ড খাড়া করে দাড়াতে পারেনি আজও।
কবিতায় প্রেম ও বিরহ চেতনার প্রভাব:
একজন কবি কখনো রাজনীতিবিদ,কখনো প্রেমিক,কখনো বিদ্রোহী-জীবনের স্রোতে এভাবেই কবি বিভিন্ন চরিত্রে আবির্ভূত হোন। প্রেম এবং নারী প্রেম—সাহিত্যের কাগজ হাতে নিলেই চোখে পড়ে। তবে খৈয়াম কাদের সেরকম প্রেমিক নন। কবি অপেক্ষায় বিশ্বাসী। প্রাপ্তির চেয়ে ত্যাগের মহিমা কবিকে সততার দিকে ইঙ্গিত দেয়। কবি এভাবে বলেন—
“যার জন্য প্রতীক্ষা তিনি আসেননি
শোনা গেছে আসবেন
হয়তো বা আসবেন অথবা না
আমাদের প্রতীক্ষারা ধৈর্যশীল”
(স্বপ্ন হরণের গর্ভাশয়,ডানাঅলা মাছ)
কবির আবেদন এখানে পরিষ্কার। প্রেমিকের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা বড় জ্বালাতনের। তবু কবি অপেক্ষা করতে চান। কবির “প্রতীক্ষারা ধৈর্যশীল”—অসাধারণ আবেগিক স্ফুরণ ঘটেছে এখানে। তারপর “আমাদের” শব্দ ব্যবহারে প্রতীক্ষা কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকেনি বরং সামষ্টিকভাবে যারা বিরহযাপন করছেন তাদের সঙ্গে নিয়েছেন। যারা অপেক্ষা করতে জানে—তারা যেন ধৈর্যশীল হয়। তারা যেনো,প্রাপ্তির নেশায় বেপরোয়া না হয়। আরেকটা কবিতার দিকে তাকাই—
“মুখ ফেরালেই যদি মনও ফেরাতে পারো
তবে তাই করো
তবে—তাই করো”
(প্রেমতোয়া নারী,ধারাপাত প্রেম)
এখানেও কবি শান্তস্বভাবি। কোন অভিযোগ,অনুযোগ নেই। বরং কবি প্রেমিকের ওপরেই নির্ভরশীল হতে চান। যদি চোখের দৃষ্টি পরিবর্তনের সাথে সাথে মনটাও পরিবর্তন করতে পারো,তবে তাই করো। এখানে কবির সৎ সাহস কবিকে মহান করে তুলেছে।
কবিতায় নারী ও নারী চেতনার প্রভাব:
কবিমানস মাত্রই নারীকে বিভিন্ন উপমায় ব্যবচ্ছেদ করেছেন। নারী কখনো নদী,কখনো পাথর,কখনো মোম—এরকম শত সহস্র অনুষঙ্গ সাহিত্যে যোগ হয়েছে। এরকম একটা লাইন—“পাথরে নির্মিত এই নারীদেহ মাঠ”। এখানে নারীদের প্রেম,প্রতারণা, নিষ্ঠুরতার দিকে চোখ তুলেছেন কবি। নারীদের মনকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নারীদের মন-হৃদয় পাথরের মতো কঠিন। “পাথর” মুলত কঠিন এবং নিষ্টুরতার প্রতীক। অর্থাৎ নারীমন পাথরই বটে। আবার আরেকটি কবিতায় বলেন এভাবে—
“দেহের ভেতরে যে রহস্য—নদী
নিরবধি বহে তার জোয়ারের পানি,
দুকূল ছাপিয়ে চলে
গন্ধম—গন্ধের ঢেউ”
(শিল্পিত সুখের খেলা,ধারাপাত প্রেম)
কবিতায় ব্যবহৃত “তার” শব্দ দিয়ে নারীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ “তার” শব্দটি নারীর রুপক অর্থে এসেছে। নারী প্রকৃতিগত দিক থেকে রহস্য নদী। অনেক কবিই নারীকে নদীর সাথে তুলনা করেছেন। নদী যেমন স্রোতস্বিনী,বহমান—নারীরাও তেমনি গোপন জোয়ারে ভাসে—এটা তাদের যৌবনসত্ত্বা। নদী যেমন রহস্যময়,তার কোথাও গভীর,কোথাও অগভীর,কোথাও লাল নীল হলুদ পানির প্রবাহমান—এখানে কবি নারীকেও সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন। নারীদের মন নদীর মতো বিচিত্র রঙের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়। আর সেটা কবির দৃষ্টিকে এড়িয়ে যেতে পারেনি। তার পরে এসে বলছেন,“দুকূল ছাপিয়ে চলে/গন্ধম-গন্ধের ঢেউ”—এখানে নারীদের শরীরী সত্ত্বার গুনকীর্তন করা হয়েছে। নদীর দুকূল ছাপিয়ে যেমন প্রকৃতির রুপ লাবণ্যের ঘ্রাণ ছড়িয়ে থাকে নারীদের শরীরে তেমনি ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য বিভিন্ন সুগন্ধীতে ভরপুর থাকে। গন্ধম ফলের একটা ইতিহাস আছে—যা হযরত আদম (আঃ) এবং হাওয়াকে কাছে যেতে নিষেধ করা সত্ত্বেও নিকটে গিয়েছিলেন এবং তখনি আল্লাহ তাদের উভয়কে দুনিয়াতে প্রেরণ করলেন। কবিতায় এই মিথ—সুঘ্রাণ এর রুপক অর্থে বহু কবি ব্যবহার করেছেন। এই চিত্রকল্পটি নারী সুন্দর্যের ইঙ্গিতময় তাৎপর্য বহন করে। এরকম আরেকটি উদ্ধৃতি এরকম—
“নদীর ভেতরে নারী,নারীর ভেতরে নদী খেলা করে
নারী—নদী মকরন্দ—সুধা জলের আকাশে ওড়ে”
(স্ফুরণের গীত)
এখানে রাখঢাক না রেখেই কবি পরিষ্কার করে বলছেন,নারীর ভেতরে যে বহমান নদী—ফলে নারীদের ভেতরে উচ্ছৃঙ্খলতার ঢেউ বিকট শব্দে আছড়ে পরার মতো। যৌবনবোধের রপক হিসেবে নারীদের শরীরীসত্ত্বার সাথে নদী শব্দটি এসেছে। মেয়ে যখন নারী হয়ে ওঠে,যৌবনপ্রাপ্তের প্রথম লগ্ন—এই বয়সটা উত্তাল ঢেউয়ের মতো। নিজেকে শৃঙ্খলে আটকাতে পারেনা। এ বাড়ি ও বাড়ি,মনে প্রেম নিবেদনের আকাঙ্খা কুড়ে কুড়ে খায়। তখনই কবি বলেন,“জলের আকাশে ওড়ে”—অর্থাৎ জলের স্রোতে তারা মত্ততায় ওড়ে। গায়ে মকরুন্দ—সুধা বা ফুলের সুবাসিত ঘ্রাণ ওদের মাতাল করে তোলে। এখানে নারী যৌবনের প্রকৃষ্ট উচ্চারণ করে কবি যে ইমেজারি তৈরি করেছেন—তা কেবল নারী সত্ত্বার সচিত্র তা নয় বরং এটা নারী জীবনের গতি,বয়সের স্তর,স্তরের তারতম্য ফুটে উঠেছে। এরকম অনেক কবিতা আছে যেখানে নদী ও নারী সংশ্লেষ পাওয়া। আরেকটি কবিতায় কবি নারীর সুন্দর্য বর্ণনা এভাবে করেছেন—
“তবুও বিশ্বাস করি নারীই তো শীলিত সত্যের প্রিয়তোষ ছবি
ফসলের গন্ধ,জলধির ছন্দ আর
পাহাড়ের সবুজ ও
বরফের শুভ্রতা রাঙা জোছনার বিভা”
(প্রেমতোয়া নারী,ধারাপাত প্রেম)
নারী কখনো ফসলের সুঘ্রাণ,নদীর স্রোতের ছন্দ,পাহাড়ের পাদদেশে সবুজ চা বাগানের মতো,আবার কখনো বরফের মতো সাদা শুভ্র। এখানে নারীর রুপশ্রী এবং তাদের গুনাগুণের যে উপমা—তা ফুটে উঠেছে। কবিমন মাত্রই প্রেমিক, চিরতরুণ, চিরযৌবনদীপ্ত। তারা কখনই বয়সের জালে আটকে থাকেন না। রঙিন ঘুড়ির মতো তাদের দৃষ্টি,দৃষ্টিভঙ্গি,কখনো কখনো প্রেমলীলায় মাতিয়ে ওঠে। তখনও কবি চুপ থাকেন না। খাতা কলম নিয়ে তার চিত্র আঁকেন এভাবে—
“চুম্বনের শিহরণ মানে
সৃষ্টি—যোজনের শুভ উদ্বোধন”
(বৃষ্টি বপনের দ্বার,মানুষের মর্ম গিলে খায়)
প্রেমের প্রবাহমানতার উপাদান হচ্ছে,খুনসুটি,গোপন সাক্ষাত, চুম্বন—এগুলো শারীরীক প্রেম প্রদর্শনের আদি দাবী। সময়ের আবর্তে এর পদ্ধতিগত পরিবর্তন আসলেও কবি ওতোটা খোলামেলা হতে চান না। কবি চুম্বনকেই বরং প্রেমের শারীরীক উদ্বোধন বলে সংজ্ঞায়িত করতে চান। এর বেশি গভীরে যেতে চান না। ওই একই কবিতায় পরের লাইনগুলো এরকম—
“গোপন নদীর জল
বৈঠার আস্বাদে কেঁপে ওঠে
কিনারে আছড়ে পড়ে
ফেনার প্রবাল!”
চুম্বনের শিহরণের শারীরীক যে প্রভাব—তার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ফলে নদীর ঢেউ আর চুম্বনের শিহরণ—পরস্পর রুপক হিসেবে ধরা দেয়। এখানে চুম্বন মহুর্তের শারীরীক শিহরণ যেভাবে শরীরে উত্তাপ ছড়িয়ে ঠোঁটে ঠোঁটে আছড়ে পড়ে,নদীর ঢেউয়ের মতো প্রবাল ফেণায় ফেণায়িত হয় দুটি শরীরের ভেতরকার স্রোত। যেনো কোন মাঝি বৈঠা মারতে মারতে দুটি শরীরকে আরো উস্কে দিচ্ছে। চিত্রকল্পে ভাবালংকার যেভাবে কাজ করেছে তা পাঠকদের ভালো লাগতে বাধ্য করবে।
কবিতায় জীবনবোধ ও জীবনসংগ্রাম :
খৈয়াম কাদের জীবনকে হিসাব নিকাশ করেছন বিভিন্নভাবে। কখনো সময়ের স্রোতের অনুকূলে, কখনো প্রতিকূলে হেঁটেছেন। ফলে বৈচিত্র অভিজ্ঞতা কবিকে শীলিত করেছে। কবি বলেন—
“ক্লান্ত সময়ের পিঠে আমি এক টাইরোসিয়াস
কালের আঘাতে বিক্ষত বৃক্ষের মতো
দৃষ্টির দর্পনে দেখি আঁধারের বাতায়ন খেলা”
(দৃষ্টির দর্পণ,পারদবিশ্বাস)
টাইরোসিয়াস এর দুটি ইতিহাস পাওয়া যায়। একটা মতে তিনি ছিলেন প্রাচীন গ্রিক পুরাণ—এর এক কিংবদন্তি ঋষি ও দ্রষ্টা যিনি ভবিষ্যৎবাণীর জন্য বিখ্যাত। আরেকটি হলো সোফোক্লেস এর একটি বিখ্যাত নাটকের নাম। কবি এখানে নিজে ঋষি বা দ্রষ্টার ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন। টাইরোসিয়াস মুলত কবির দর্শনচিন্তার প্রতীকী উপমা। আর “সময়ের পিঠ” এখানে জীবনের যে গতিময় ছন্দ—তার রুপক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কবি ঋষির মতো জীবনকে উপভোগ করছেন,কালের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত বৃক্ষের মতো। জীবন মানেই যুদ্ধের মতো মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বা ঘটনা—যেখানে দুঃখ কষ্ট,আঘাত প্রতিঘাত আছে এবং এর ভেতর দিয়েই যেতে হয় মানুষকে। কবি তাই দৃষ্টির আয়নায় “আঁধার” দেখেন সব সময়। আঁধার মুলত সমাজের দৃস্কৃতি,কুসংস্কার,মন্দ প্রভাব,যা কিছু সমাজকে কলুষিত করছে—তার ইঙ্গিতময় রুপক হিসেবে এসেছে। “আঁধারের বাতায়ন খেলা করে’—বাতাসে দোলনার মতো এই অন্ধকার দুলছে,কবি জানেন না কতদিন এই বাতায়ন খেলা করবে। এক অনিশ্চিত অন্ধকার এবং অনিশ্চিত সময় ধরে সমাজে ছড়িয়ে যাচ্ছে—তাতে কবি উদ্বিগ্ন। এটাই জীবনের গতির প্রভাব। একই কবিতায় পরের লাইনে বলছেন—
“অতঃপর এই সরাইখানাতে ব’সে
ভাঙ্গনের নির্জলা প্রহর ভাঙ্গি শাশ্বত প্রতীক্ষা নিয়ে”
এখানে সরাইখানা মুলত এই নিখিল—বসুধার প্রতীকী শব্দ। যেখানে কবি উদ্বিগ্নচিত্তে বসে আছেন। জীবনের ভাঙ্গা গড়ার প্রতিমহুর্তের হিসাব গুনছেন এবং প্রতীক্ষা করছেন। জীবন বীক্ষণের দিকে টেনে নিয়ে যায়—এরকম অনেক উদ্ধৃতি বিভিন্ন কবিতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেমন বলেন—
“বিকল গাড়িটা কেন যে হয় নি মেরামত আজো
ওঠেনি কপাট কেন দূর্গ তোরণের মুখে
সেকথা কারোর জানা নেই
জানা নেই কখন থামবে ঘরের তুফান এই তমালোকে”
(ঘরের তুফান,পারদ বিশ্বাস)
এই চিত্রকল্প আমাকে ভালো টেনেছে। কবি জীবন সংগ্রামে হাঁটছেন শহরে বন্দরে গ্রামে। চোখে পড়ে বিকল গাড়িটা পড়ে আছে পাশে। মেরামত হয়নি আজও। কবি এই মেরামতের সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ খুঁজে পান না। ঠিক এইভাবে এই গতিময় জীবনও একদিন মেরামত হবে না। নিথরে পড়ে থাকবে। কবি হতাশায় ভোগেন। এখানে “বিকল গাড়িটা” কেবল কোন নষ্ট যন্ত্র নয় বরং জীবনের স্থবিরতার দিকে ইঙ্গিত করে। তার পর বলছেন “ওঠেনি কপাট কেন দূর্গ তোরণের মুখে”—এটা মুলত অবরুদ্ধ জীবনের প্রতীকী উচ্চারণ। ফুল সজ্জায় সজ্জিত দূর্গ বা ঘর—তার দরজা এখনো খুলছে না। মুলত এখানে জাতির মুক্তির দরজা খোলা হচ্ছে না। কে খুলবে,কখন খুলবে—কেউ জানে না। সে কথা কারো জানা নেই। তারপর বলছেন ঘরের তুফান কে থামাবে। এখানে তুফান মুলত দ্বন্দ্বের প্রতীকী শব্দ। মানব জীবনের পারিবারিক দ্বন্দ্ব,ঝগড়া—এটা মুলত তমালোকের মতোই সমাজে ছড়িয়ে আছে। “তমালোক” বা অন্ধকার—মুলত সামাজিক অপসংস্কৃতি এবং মন্দের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এই চিত্রকল্প জীবন সংগ্রামের গভীর দর্শনের দিকে পাঠককে নিপতিত করে। এরকম আরেকটি কবিতার দিকে চোক দেয়া যাক—
“হাঁটতে নেমে দেখেছি
পায়ের সীমানা থেকে সরে যাচ্ছে পথ
উড়ে যাচ্ছে ঘর,বাতাসে আটকে আছে প্রাপ্য সকাল
চোখ মানছে না মগজের নির্দেশনা
দৃশ্যগুলো হয়ে যাচ্ছে বিনয়ী মাতাল!”
(অবাচ্য শব্দের অভিধান,ডানাঅলা মাছ)
জীবনের যে গতি—এ যেন শেষ হবার নয়। কবি তাই বলছেন “পায়ের সীমানা থেকে সরে যাচ্ছে পথ”—অর্থাৎ এই গতির ধারাবাহিকতা অনিঃশেষ,কবি যতই হাঁটছেন মাটি সরে যায়। পথ আরো দীর্ঘ হয়। নিজের বসবাস করা দীর্ঘ জীবনের ঘর দোর—কিছুই স্থির থাকছেনা। সকালও ঠিকঠাক দৌড়াতে পারছে না—বাতাসে আটকে যাচ্ছে। তার পরের লাইনটা আরো গভীরে নিয়ে যায়— “চোখ মানছে না মগজের নির্দেশনা। এটি একটি বৈজ্ঞানিক থিওরী। মগজ বা ব্রেইন প্রথমে চলমান সংকেত পাঠায় নির্দিষ্ট অঙ্গে—তারপর সেই অঙ্গ চালিত হয়। মগজের সেই নির্দেশনা বা সংকেত চোখ মানতে পারছে না,কারণ চোখ যা দেখছে, যে সমস্ত দৃশ্য— তা মাতালের মতো দিশাহীনভাবে গতিময়। চোখ এই গতিকে সহজে ধরতে পারে না। কবি এখানে গতিবিদ্যার চমৎকার দর্শন স্থাপন করতে পেরেছেন বলে নির্দ্বিধায় বলতে পারি।
কবিতায় পশুপ্রেম চেতনার প্রভাব:
খৈয়াম কাদের তার কবিজীবনে কখনো প্রকৃতিপ্রেমিক,কখনো মানবপ্রেমিক হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন। পশু প্রেমও কবির কলম এড়িয়ে যেতে পারেনি। যেমন বলেন—
“এই বেড়াল পঁইপঁই ক’রে অন্দরমহল চষে ফেরে
মাছের উচ্ছিষ্টে নয়,দুধের বাটিতে রাখে মুখ”
(যে চোখ বহন করে হিমালয়,পারদ বিশ্বাস)
অসম্ভব পশুপ্রেমের চিত্র হতে পারে এটা। কবি দেখছেন,বেড়াল দুধের বাটিতে মুখ দিচ্ছেন—তবু কবি চেয়ে চেয়ে দেখছেন। ঘরের আনাচে কানাচে পঁই পঁই করে বেড়াল চষে বেড়ায়—কবি কিছু না বলে বরং কবিতায় তা তুলে আনেন। এখানে কবি মহান হয়ে উঠেছেন তার পশু প্রেমের দৃশ্যকল্পের মধ্য দিয়ে।
কবিতায় বাউল,মােরফতি চেনার প্রভাব:
কবির দৃষ্টিভঙ্গি বিচিত্রময়। চলতে ফিরতে বহুজনের সাথে দেখা হয়,কথা হয়—সেটাও অনেক সময় দূর্দান্ত কবিতার উপাদান হয়। যেমন কবি বলেন—
“ছকমান বয়াতির মারেফতি গান ফিরে দাও
ফিরে দাও চিত্তমর্মর মুর্শিদি
আর
ধুয়া
জারি
সারি”
(আমাকে ফিরিয়ে দাও,লাঙ্গলের খেয়া ভাঙ্গে জীবনের গতি)
এখানে ছকমান বয়াতির কৃতকর্ম,গান কবিকে ভাবিত করে। তিনি মারা গেছেন বহুবছর আগে। তবুও কবির স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ছকমান বয়াতি। তাই তো কবি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন, ফিরে দাও তার জারি সারি মুর্শিদি গান।
কবিতায় কৃষক ভাবনার উন্মেষ
কবি যখন কৃষি ক্ষেতের আলপথে হাঁটেন,কৃষকদের ফসল রোপন পদ্ধতি দেখেন তখন আপ্লুত হোন। তারাও কতোনা সময়সচেতন মানুষ। হয়তো তারা নিজের খাওয়া দাওযা,শরীরের যত্ন নেওয়ার বিষয়ে ওতোটা সচেতন নয় কিন্তু জমিতে ফসল রোপনের সময় সম্পর্কে দারুনভাবে ওয়াকিবহাল। কবির কলমে কৃষকদের কর্ষণ, শস্য ফলানোর ইঙ্গিত পাওয়া যায় এখানে—
“বারুদে বারুদ ঘষলে আগুন জ্বলবেই
ফসলও ফলবেই
যদি বাত বুঝে জমিতে শস্যের বীজ বোনা যায়”
(শেরোয়ানী মাঠ, শেরোয়ানী মাঠ)
প্রতিটি ফসলের উপযুক্ত সময় এবং উপযুক্ত মাটির প্রয়োজন। প্রকৃতির চরাচরে অজস্র মাটির প্রকারভেদ আছে এবং মৌসুম অনুয়ায়ী মাটির উর্বরতা লক্ষণীয়। তাই কবি বলছেন “বাত” বুঝে জমিতে শস্য বুনলে ফসল নিশ্চিত হয়। এখানে “বাত” শব্দটি আঞ্চলিক এবং কৃষকদের মুখে রচিত একটি শব্দ যার অর্থ মাটিতে হালকা রস বা ভেজাভাব থাকা। এটি বগুড়ার কৃষকদের মুখের ভাষা। এই অংশ কৃষককদের নির্দেশ করছে,একেবারে শুকনো মাটিতে ফসল ভালো হয় না। বরং কবি নিশ্চয়তা প্রদান করছেন এভাবে যে,বারুদে বারুদ ঘষলে যেমন আগুন জ্বলবেই তেমনি “বাত” বুঝে জমিতে বীজ দিলেও ফসল ঘরে আসবেই। এই চিত্রকল্প কেবল কৃষিক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয় বরং মানবজন্মের প্রতিও ইঙ্গিতময় উচ্চারণ। যত্রতত্র নারী বা পুরুষের দ্বারা ভালো সন্তান আশা করা যায় না। এই “বাত” শব্দটি কবিতার ভাষায় এই প্রথম এসেছে বলে আমার ধারনা।
কবিতায় বায়ুদূষণ চিন্তার প্রকাশ:
প্রকৃতিতে কার্বনের ছড়াছড়ি,আর্সেনিক,বায়ু দুষণ—এই বিষয়ভাবনা কবিতায় তেমন চোখে পড়েনা। কিন্ত খৈয়াম কাদের এটিকে গুরুত্ব দিয়েছেন—কারণ এর ক্ষতি সমাজে এবং প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যপকভাবে। কবি বলেন—
“আমাদের চারদিকে আগুন-হাওয়া
বাতাসে কার্বন আর
পানিতে আর্সেনিক ভাসে
দূষণ দহনে ভাসে
নিসর্গ লাস্যের
স্বর্গস্নাত কায়া”
(প্রেমতোয়া নারী,ধারাপাত প্রেম)
নিসর্গ বা এই পৃথিবী স্বর্গস্নাতের ছায়ার মতো সুন্দর এবং মোহনীয়। এখানকার আলো বাতাসে মানুষসহ সকল প্রাণীকুল সুস্থভাবে নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচতে পারে। অথচ কবি উদ্বিগ্ন এখানেই যে—প্রাণীকুল বাঁচবে কিভাবে। চারদিকে ইটভাটা,কলকারখানার কালো ধুঁয়া যেভাবে বাতাসকে দূষিত করছে তাতে অনতিবিলম্বে এর কুপ্রভাবে সমাজে পড়বে। বেঁচে থাকার মৌল উপাদান নিঃশ্বাস—যা মানুষ গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। এই কার্বনমিম্রিত বায়ুই মানুষকে প্রতিনিয়ত গ্রহণ করতে হয়। কবি বলছেন আমাদের চারপাশ স্বর্গের মতো। অথচ কবি ব্যথিত হোন। পানিতে আর্সেনিক—এটাও মানুষের শরীরের ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে প্রকটভাবে। কবি এখানেও থমকে আছেন চিন্তামগ্নতায়।
কবিতায় বিচত্রি শব্দের উপস্থিতি
খেয়াম কাদের শব্দ গড়ার কবি বলা যেতে পারে। তার প্রতিটি কবিতায় প্রচলিত,অপ্রচলিত অথচ বিস্ময়কর অর্থপূর্ণ অজস্র শব্দের সন্ধান পাওয়া যায়। সেগুলো কখনো একক শব্দ, কখনো শব্দবন্ধনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তার কিছু তুলে ধরা হলো—
পরীদের জঙ্গলঘর,সফেদ সোয়ান,সংবেদ,বালেগ,জলের অক্ষর ধুয়ে,ঋসির পুস্তক ভণে,অমিতাভ স্মৃতি,পাথর ভ্রমণ,মানব রসায়ন.আলফা জাগরণ,কারুজ্য কাথান,বৃক্ষের বাকল,নারীদেহ মাঠ,নিয়ন সানাই,ঝড়ের নিনাদ,ধানের পরাগ,শেরোয়নিী মাঠ,যামিনীর জাজিম,পাখিনগর—এরকম হাজারো মব্দ সম্ভারের আবিষ্কার লক্ষ্য করা যায়।
সর্বোপরি খৈয়াম কাদের পাঠান্তে আমার সামান্য ব্যবচ্ছেদে হয়তো পুঙ্খানুপঙ্খভাবে চিত্রায়ন করতে পারবো না। একজন কবির জীবদ্দশায় ঘটমান কথা এবং দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তৃতি ব্যাপক। একজন সমালোচক তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কতোটুকুইবা তুলে আনতে পারেন। অনেক বিষয অধরায় থেকে যায়। সে দিক বিবেচনায় আমার প্রচেষ্টা— নিজের ধৈর্য,উপলব্ধি,জ্ঞান মিলমিশে একটা কিছু অবয়ব দেয়ার চেষ্টা করেছি। খৈয়াম কাদের একজন বিচিত্র চিন্তার কবি এটা নিশ্চিন্তে বলা যায়। তার কবিতায় খুব সুক্ষ্ণ সুক্ষ্ণ বিষয় কবিতার ভাষা পেয়েছে। প্রকৃতির নদী নালা,ঘর বাড়ি,মাঝি, জেলে,কৃষক,নারী,প্রেম,দ্রোহ—সব কিছুই কোন না কোন চিত্রকল্পের অনুষঙ্গ হয়েছে। কবির কবিতার শরীর কখনো ছোট,কখনো মাঝারি কখনো বড় অবয়বে এসেছে। ভাষাগত দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,অধিকাংশ কবিতার ভাষা খুব টাইট,ঠাসা ঠাসা শব্দের ব্যবহারে পাঠক খানিকটা বিভ্রান্ত হতে পারেন। অনেক বোদ্ধা তো সেটাই ভাবেন,কবিতা কাউকে বোঝায় না। কবি বুদ্ধদেব বসু কবিতাকে এভাবে ভেবেছেন “কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনা, কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না, ‘বোঝানো ‘ যাবে না” —খৈয়াম কাদেরের অধিকাংশ কবিতা এরকম বিশেষণ করা যেতে পারে। সেরকম চরিত্র নিয়েই মুলত কবিতার ভাষা দেয়ার চেষ্টা করেছেন কবি। পাঠক কখনো সহজে স্বাদ নিতে পারবে, কখনো গভীরে প্রবেশ করে মণিমুক্তা এবং প্রকৃত স্বাদ কুড়িয়ে আনতে হবে। শিল্পই সৃষ্টির মুল প্রতিপাদ্য বিষয়—সে বিবেচনায় সময়ের মুখোমুখি হতে হবে আরো। তবে কবির কবিতার যে ধার—কোন এক সময়; সময় তাকে তুলে আনতে বাধ্য হবে।
আরো পড়ুন
খিদে ও অন্যান্য কবিতা পড়ুন এখানে
নগর পিতা পড়ুন এখানে
খৈয় কাদের বিষয়ক প্রবন্ধ পড়ুন এখানে
অনুতাপ পড়ুন এখানে
নকল চোখ পড়ুন এখানে
